বাবুই পাখির যত দূষ, গুন



বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,
“কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই,
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে
তুমি কত কষ্ট পাও রোধ, বৃষ্টির, ঝড়ে।”

কবি ‘রজনীকান্ত সেনের’ বাবুই পাখিকে নিয়ে কালজয়ী‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতাটি আজো মানুষের হৃদয়ে স্থান দখল করে আছে। কবি যেভাবে বাবুই পাখির শিল্পের বর্ননা ফুটিয়ে তুলেছে, সে শিল্প স্থাপন করতে বাবুই কে অনেক কৌশলের পথ অবলম্বন করতে হয়। আজ জানব বাবুই এর সেই রহস্যময় শিল্পের দূষ গুনের কথা।

বাবুই শুধু নির্মাণ শিল্পীই নয়, পাখিদের মধ্যে সবচেয়ে রোমান্টিক পাখি। স্ত্রী বাবুইকে কাছে পেতে প্রথমে গান গেয়ে আকর্ষণের চেষ্টা করে তার পর দক্ষতা দেখাতে বাসার অর্ধেকটা বুনে স্ত্রী বাবুইকে ডেকে এনে দেখায়। মন ভুলানোর পালা চলে তখন। এভাবে সঙ্গ জুটলে মনের আনন্দে ভালবাসার গান গেয়ে ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে বাসা তৈরি করে।

-প্রেমিক বাবুই যত প্রেম দেখাক না কেন, প্রেমিকা ডিম দেয়ার সাথে সাথেই প্রেমিক বাবুই আবার খুঁজতে থাকে অন্য সঙ্গী।একটি বাবুই পাখি এক মৌসুমে ৫ থেকে ৬টি বাসা বুনতে পারে। আর ৫ থেকে ৬টা বাসা মানেই তারসঙ্গিনীও ৫,৬টা।অর্থাৎ এরা ঘর-সংসার করতে পারে ছয় সঙ্গীর সঙ্গে; তাতে স্ত্রী বাবুইয়ের বাধা নেই। এ সকল বাসা নির্মানে পুরুষ বাবুয়টি তার বাসস্থান নির্ধারন করে থাকে।Capture

– বাবুই কে দক্ষ’আর্কিটেক্ট’ বললেও ভুল হবে না।এই বাসা তৈরিতে বাবুই প্রতিদিন সকালে এবং বিকেলে দু’বার করে সময় দেয়। বাসা তৈরিতে বাবুই খড়, ধানপাতা, তালপাতা, কাশবনের ছাল, নারকেল পাতা ব্যবহার করে থাকে।এরা এসব পাতার ১২-১৭ সেমি অংশ ঠোঁটে নিয়ে দক্ষ বুননে বাসা বানায় উঁচু গাছের পাতায়। প্রতিটি বুননই মনে হয় যেন কাথা সেলায় করছে আর এজন্যয় ভারতে বাবুইকে তাতি পাখি বলে।­

– এদের নির্মাণকৌশল বিজ্ঞানভিত্তিক। তাদের বাসার নিচে নলের মতো লম্বা দরজা রাখে। ভিতরে পাঁচটি কক্ষ থাকে,একেবারে শিল্পসম্মত খোপ। আলো বাতাস প্রবেশের চমৎকার ব্যবস্থা। বুনট এতটাই শক্ত যে সহজে টেনে ছেঁড়া যাবে না। এমনকি প্রচণ্ড ঝড়ে দোল খেলেও বাবুই পাখির বাসা ছিঁড়ে পড়ে না। উল্টে গেলে বাসার ভিতরে বাবুইয়ের ডিমও ছিটকে পড়ে না। বাসার আঁতুড়ঘরের নির্মাণ কৌশলটি এমনই।

– বাসা তৈরিতে এরা সাধারনত নারিকেল, তাল, সুপাড়ি, খেজুর ও পাম গাছ ব্যবহার করে।এই সকল নতুন জায়গা নির্ধারনের জন্য অন্য প্রজাতির পাখিদের সাথে তাদের ঝগড়া করতে হয় তবে ঝগড়াতে বাবুয়ই জয়ী হয়।

– বাবুই পাখির প্রজনন মৌসুম হলো ধান ঘরে ওঠার মৌসুম।প্রজনন প্রক্রিয়ায় স্ত্রী বাবুই ডিমে তা দেয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা ফোটে। আর তিন সপ্তাহ পর পুরুষ বাবুই বাচ্চা ছেড়ে উড়ে যায়।স্ত্রী বাবুই দুধধান সংগ্রহ করে এনে বাচ্চাদের খাওয়ায়।

– বাবুইঝাঁক বেঁধে ফসলের মাঠে নামে, সেজন্য কথিত আছে বাবুয় একবার যে ফসলের মাঠে নামে সে ফসলের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যায়।

– বাবুই পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো রাতের বেলায় ঘর আলোকিত করার জন্য এরা জোনাকি পোকা ধরে নিয়ে বাসায় রাখে এবং সকাল হলে আবার তাদের ছেড়ে দেয়।

– সারাবিশ্বে বাবুই প্রজাতি পাখির সংখ্যা ১১৭। তবে বাংলাদেশে তিন প্রজাতির বাবুই দেখা যায়।উভয় বাবুই অনুরূপ চড়াই এর মত, (১৫সেমি)আকারের।প্রজনন সময় ছাড়া অন্য সময় পুরুষ ও স্ত্রী পাখির গায়ে কালো কালো দাগসহ পিঠ হয় তামাটে বর্ণের। নিচের দিকে কোন দাগ থাকে না। ঠোঁট পুরো মোছাকার, লেজ চৌকা। তবে প্রজননের সময় পুরুষদের একটি উজ্জ্বল হলুদ মুকুট, গাঢ় বাদামী মাস্ক, কালচে বাদামী বিল হয়, উপরের অংশ গাঢ় বাদামী নিচে একটি হলুদ স্তন এবং ক্রিম বাদামি সঙ্গেহলুদ হয়।

– বিভিন্ন দেশে বাবুই এর আঞ্চলিক নামঃ chiri (হিন্দি); bayya chirya ( উর্দু); baya chadei(ওড়িয়া); sugaran (মারাঠি); tempua (মালয়); sughari (গুজরাটি); babui (বাংলা); parsupu Pita, gijigadu /gijjigadu (তেলুগু)

Facebook Comments
It's only fair to share...Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
0