“ওরা সব কাম করতে পারে, খালি কতা কইতে পারে না”



বোবাদের ছবি

কন্ঠে নয় কায়িক শ্রমে টিকে আছে অরুনা বেগমের চার সন্তান। ছবিঃ মোঃ জহিরুল ইসলাম

“ওরা সব কাম করতে পারে, খালি কতা কইতে পারে না,”১৬ই এপ্রিল  “বিশ্ব কন্ঠ দিবসে” অরুনা বেগম এর পরিবারের কথা জানাচ্ছেন পটুয়াখালী প্রতিনিধি, মোঃ জহিরুল ইসলাম।

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নের দক্ষিন চর ওয়াডেল এলাকার তেঁতুলিয়া নদী পাড়ের বাসিন্দা অরুনা বেগম। চার সন্তান কথা বলতে না পারার আক্ষেপে এ মন্তব্য করেন তিনি আরো বলেন, ‘ওরা সব কাম করতে পারে, খালি কতা কইতে পারে না। ‘আমার এই চাইর (চার) পোলার মোহে (মুখে) জীবনে মা ডাক হুনি নাই। আল্লাহর দুন্নাইতে কত মানুষ। সব মাইনসে কতা কয়, আমার পোলারা কতা কইতে পারে না। মার ধারে এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কি অইতে পারে।’ অগোরে আল্লায় বোবা বানাইছে। হুনছি তিকিৎছা করলে বোবারাও ভাল অয়। আমগো কামাই কোম। রোজ আনি রোজ খাই। কেমনে অগোরে টাহা খরচ কইরগা তিকিৎছা করমু।’

একদিকে সন্তানদের মুখ থেকে মা ডাক শুনতে না পারার আক্ষেপ।অপরদিকে অভিভাবক হয়েও অভাবের কারণে সন্তানদের চিকিৎসা না করতে পারার কষ্ট নিয়ে জীবন চলছে মা অরুনা এবং বাবা মো. সিরাজ চৌকিদারের। প্রায় ৩৫ বছর আগে অরুনা বেগম ও সিরাজ চৌকদারের বিয়ে হয়। বিয়ের পর এই দম্পত্তির প্রথম সন্তান মো. ইউসুফ। চরে বসতি, তাই ছেলে সন্তানের জন্মালে বেশ খুশি হয় চরের বাবা মায়েরা। তেমনি ইউসুফের জন্মেও খুব খুশি হয়েছিলেন ওদের মা এবং বাবা। কিন্তু বয়স বাড়ায় ইউসুফ যখন কথা কলতে পারছিল না তখন হতাশা ঘিরে ধরে ওই বাবা-মাকে। এরপর দ্বিতীয় সন্তান ইলিয়াসের জন্মের পর সে হতাশা মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন অরুনা সিরাজ দম্পত্তি। কিন্তু ভাগ্য সহায় হয়নি। এরপর ওয়াহিদ এবং নেছারের জন্মেও মা ডাক শোনার আশা পূরণ করতে পারেনি অরুনা। চার সন্তানের একই অবস্থা, ওরা সবাই ‘বধির’।

সন্তানদের এ অবস্থায় জেলে পেশার সাথে জড়িত বাবা সিরাজ চৌকিদারের কখনো সামর্থ হয়ে ওঠেনি অর্থ ব্যয় করে সন্তানদের চিকিৎসা করানোর। তাই তাঁর স্ত্রী অরুনা প্রায় ১০ বছর আগে ওই চার সন্তানকে নিয়ে ছুটে যান চরে বছরে একবার আগমন করা জৈনপুরী পীর সাহেবের কাছে। তিনি অরুনা বেগমের সব কথা শুনে জানিয়ে দেন ঢাকায় নিয়ে ভাল ডাক্তার দেখালে ওরা হয়তো কথা বলতে পারবে। কিন্তু সে আর্থিক সামর্থ সিরাজ পরিবারের জন্য আজ অবদি হয়ে ওঠেনি। সিরাজ চৌকিদার বলেন, ‘নদীতে মাছ পাওন যায় না। ভাত জোডে না ঠিক মোত। তিকিৎছা করণের টাহা পামু কই।’ বধির হওয়ার ফলে লেখাপড়া হয়নি চারজনেরই। ফলে ছোট বেলা থেকেই ওরা নদীতে বাবার সাথে মাছ ধরার কাজ করে আসছে। আর এ কাজেই নিজেদেরকে ব্যস্ত রাখে ওরা চারজন। প্রত্যেকেই এখন জেলে পেশায় পরিপক্ক। জাল নৌকা নিয়ে তেঁতুলিয়ায় ছুটে যায় আবার সময় হলে বাড়ি ফিরে আসে। প্রতিদিন এ খেলায় ব্যস্ত থাকে ওরা চার ভাই।
এদিকে পাঁচ বছর আগে বড় ছেলে ইউসুফ বিয়ে করেছে। স্ত্রীর নাম সাথী বেগম। এ দম্পত্তির রয়েছে রনি নামের তিন বছরের এক শিশু সন্তান। ইউসুফের স্ত্রী সাথী বেগম বলেন, ‘আমার ছোড পোলায়(রনি) আদর কইরগা কত কতা কয় বাহেরে (বাবাকে)। পোলার বাপ অইয়াও পোলারে ডাকতে পারে না। এডা একটা মাইনসের বড় কষ্ট। আমাগো টাহা থাকলে চিকিৎছা করইগা দেখতাম।’

এ ব্যাপারে পটুয়খালীর সিভিল সার্জন ডা. এ এম মজিবুল হকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা ব্যবস্থা এখন অনেক আধুনিক এবং প্রযুক্তি সমৃদ্ধ। এ অবস্থায় এদেরকে নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞদের কাছে নিয়ে গেলে তারা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে বলতে পারবেন। তবে আধুনিক চিকিৎসায় ব্যবস্থায় অনেক বধিরের কণ্ঠ ফিরে এসেছে।’

Facebook Comments
It's only fair to share...Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
0