মে দিবস : কিছু ভাবনা



may-day১লা মে অান্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস, মে দিবস নামে খুবই পরিচিত, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার অাদায় করতে ১৮৮৬ সালের এক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ১৮৯০ থেকে পালিত হচ্ছে মে দিবস। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সরকারি অথবা বেসরকারি ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে সম্পূর্ণ করছে দিবসটি।

বাংলাদেশ সরকারও এবছর (২০১৫)  দিবসটি পালন করার জন্য কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এবারের মে দিবস এর প্রতিপাদ্য ‘শ্রমিক-মালিক ঐক্য গড়ি, সোনার বাংলা গড়ে তুলি’।  এছাড়া র‌্যালি, সেমিনার, সভা, সংবাদ সম্মেলন তো অাছেই।

মে দিবসের পটভূমি : ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শ্রমিক সংগঠন আট ঘন্টা  শ্রমদিনের দাবিতে ১৮৮৬ সালের পহেলা মে পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় শ্রমিকরা ৪ঠা মে শিকাগো শহরের হে মার্কেট নামক বাণিজ্যিক এলাকায় জড়ো হতে থাকে। এক সময় পুলিশের সাথে সংঘর্ষ  বেঁধে যায়। এবং কয়েক জন শ্রমিক নির্মম ভাবে নিহত হয়। কথিত আছে প্রথমে একজন শ্রমিক পুলিশকে লক্ষ করে বোমা নিক্ষেপ করে। তবে কে করেছে তা আজো জানা য়ায়নি। এরই প্রেক্ষিতে ১৮৯০ সালে পহেলা মে দিনটিকে শ্রমিক দিবস ঘোষণা করা হয়। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে ১লা মে জাতীয় ছুটির দিন এবং সারা বিশ্ব মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে।

এবার বাংলাদেশের দিকে তাকাই। কি আবস্হায় আছে দেশের শ্রমিকরা? তারা কি তাদের  ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে নাকি বঞ্চিত হচ্ছে? এ প্রশ্নেগুলোর জবাব দিতে হলে নজর দিতে হবে শ্রমক্ষেত্রের সার্বিক অবস্থার দিকে। বাংলাদেশের শ্রমিকদের অসহায়ত্বের নজির এখন বিরল নয়।

পোশাক শ্রমিকদের অবস্থা বর্ণনা করতে গা শিহরিত হয়। তাজরিন ফ্যাশনে আগুনে দগ্ধ হয়ে নিজের প্রাণকে উড়ে যেতে দেখেছে শ্রমিকরা নিজ চোখে। কি এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল ২৪ শে এপ্রিল ২০১৩ তারিখে।  কতটি প্রাণ শেষ হলো। কত গুলো পরিবার নিরুপায় হলো। তাদেরকে  মৃত্যু ফাঁদে যেতে হলো জোরপূর্বক।  ভবন ধসের পূর্বের দিন ফাটল দেখলেও কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এসব কিছুই কি শ্রমিকদের অসহায়ত্বেরর প্রমাণ নয়?

শুধু তাই নয় নিজের ভিটা- জমি বিক্রি করে অন্য দেশে যায় শ্রমিকরা।  প্রবাসে শ্রমিকদের কি অবস্থা?  অনেকে বিদেশ যাওয়া আগ মুহুর্তে বুঝতে পারে  সে প্রতারণার শিকার। বন্ধ হয়ে যায় তার প্রবাসী শ্রমিক হবার সুযোগ । প্রবাসে গিয়ে তাদের আনেকের শান্তি মিলে না। রাষ্ট্রীয় দূতাবাসে আশ্রয় চায়। সেখান থেকেও সাড়া পায় না কারণ তারা বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এদের মাধ্যমে যে দেশে বৈদেশিক মূদ্রা আয় হয় তা তখন ভুলে যায়।

শ্রমিকের সারি হতে তারাও বাদ পরে না যারা অন্যের ঘরে ছোট খাট কাজ করে। তাদের উপর যে নির্যাতন হয় না তা নয়। প্রায় পত্র পত্রিকায় দেখা যায় সামান্য কারণে গৃহকর্তা, গৃহকর্ত্রী কিংবা অন্য কোন সদস্য কর্তৃক কাজের ছেলে আথবা মেয়ের উপর বর্বর নির্যাতন।  লোহার শিক পুরে সেক দেয়ার মত নজিরও লক্ষ করা যায়।

বাংলাদেশে শিশু শ্রমের ব্যাপকতা কম নয়। পাথর ভাঙ্গা, বোঝা বহন করা, লোহার পাত দ্বারা যন্ত্র তৈরি ইত্যাদি মত ঝুকিপূর্ণ কাজে তারা শ্রম দিচ্ছে। অথচ এ সময় কথা ছিল তারা বই, খাতা, পেনসিল নিয়ে স্কুলে যাওয়ার।

এখন কথা হচ্ছে তাজরিনের আগুনে দগ্ধ, রানা প্লাজার হু হু আর্তনাদ, প্রবাসী শ্রমিকের প্রতারণার শিকার, কাজের ছেলের আমানসিক নির্যাতন,  শিশুদের অবুঝ শ্রম বন্ধ হবে কিভাবে।

প্রতি বছরই শ্রম দিবস পালন করা হয়, এবং সামনেও হবে।  ঘোষণা হবে র‌্যালি, সভা, সংবাদ সম্মলনের মত কর্মসূচী। কিন্তু সবাই যদি নিজের জায়গা থেকে সচেতন না হয় তাহলে এসব বন্ধ করা সম্ভব নয়।

আরো প্রয়োজন সময় উপযোগি, মালিক-শ্রমিক ভারসম্যপূর্ণ, প্রকৃত, অর্থবহ আইন প্রণয়ন ও তার কার্যকর করা।  কারণ যদি কেউ একটি সুন্দর পোশাক ক্রয় করে আর সেটা পরিধান না করে তাহলে তার ক্রয় করাটা যথাযথ হবে না। তেমনি অর্থবহ আইন করা হলো কিন্তু তার প্রয়োগ হলো না তাহলে তাও যথাযথ হবে না। আবার আইনের সঠিক প্রয়োগ না করা হলে এমনটা হবে যে,  পোশাকটা উলটো ভাবে পরিধান করলো যা দেখতে অসুন্দর লাগবে।

কাজী নজরুল ইসলামের একটি বাণী  দিয়ে শেষ করব -”  গাহি তাহাদের গান-
ধরণীর হাতে দিল যারা আনি’ ফসলের ফরমান।
শ্রম-কিণাঙ্ক-কঠিন যাদের নির্দয় মুঠি-তলে
ত্রস্তা ধরণী নজরানা দেয় ডালি ভ’রে ফুলে-ফলে!”

 

আব্দুল মান্নান, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জাহানঙ্গীরনগর  বিশ্ববিদ্যালয়।
munnaju43@gmail.com

Facebook Comments
It's only fair to share...Share on Facebook
Facebook
10Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
0