শ্রেষ্ঠ রজনী সম্পর্কে সূরা আল-কদরের বিশ্লেষণ



IslamicArchitectureনামকরনঃ প্রথম আয়াতের আল কদর শব্দটিকে এর নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

অর্থঃ আমি এ (কুরআন) নাযিল করেছি কদরের রাতে।(১) তুমি কি জানো, কদরের রাত কি? কদরের রাত হাজার মাসের চাইতেও বেশি ভালো।(২) ফেরেশতারা ও রুহ(৩) এই     রাতে তাদের রবের অনুমতিক্রমে প্রত্যেকটি হুকুম নিয়ে নাযিল হয়।(৪) এ রাতটি পুরোপুরি শান্তিময় ফজরের উদয় পর্যন্ত।(৫)

ব্যখ্যাঃ এখানে বলা হয়েছে “আমি কদরের রাতে কুরআন নাযিল করেছি আবার সূরা বাকারায় বলা হয়েছে, “রমযান মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে”।(১৮৫ আয়াত)

এ থেকে জানা যায়, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে হেরা গুহায় যে রাতে আল্লাহর ফেরেশতা অহী নিয়ে এসেছিলেন সেটি ছিল রমযানের মাসের একটি রাত। এই রাতকে এখানে কদরের রাত বলা হয়েছে। সূরা দুখানে একে মুবারক রাত বলা হয়েছে। বলা হয়েছেঃ “অবশ্য আমি একে একটি বরকতপূর্ণ রাতে নাযিল করেছি”। (৩ আয়াত)

কোন কোন তাফসিরকারক কদরকে তকদীর অর্থে গ্রহন করেছেন। অর্থাৎ এই রাতে আল্লাহ তকদিরের ফায়সালা জারী করার জন্য তা ফেরেশেতাদের হাতে তুলে দেন। সূরা দুখানের নিমোক্ত আয়াতটি এই বক্তব্য সমর্থন করেঃ  “এই রাতে সব ব্যপারে জ্ঞানগর্ভ ফায়সালা প্রকাশ করা হয়ে থাকে”। (৪ আয়াত)

কদরের রাত সম্পর্কে প্রায় ৪০টি মতের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে আলেম সমাজের সংখ্যাগুরু অংশের মতে রমযানের শেষ দশ তারিখের কোন একটি বেজোড় রাত হচ্ছে এই কদরের রাত। আবার তাদের মধ্যেও বেশিরভাগ লোকের মত হচ্ছে সেটি সাতাশ তারিখের রাত।

এ প্রসঙ্গে বর্নিত নির্ভরযোগ্য হাদীসগুলো এখানে উল্লেখ করছিঃ

হযরত আবু হুরায়রা(রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বলেছেনঃ সেটি সাতাশের বা উনত্রিশের রাত। (আবু দাউদ) হযরত আবু হুরায়রা(রা) অন্য একটি রেওয়াতে বলা হয়েছে সেটি রমযানের শেষ রাত।(মুসনাদে আহমাদ)

যির ইবনে হুবাইশ হযরত উবাই ইবনে কা’বকে(রা) কদরের রাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। তিনি হলফ করে কোন কিছুকে ব্যতিক্রম হিসেবে দাঁড় না করিয়ে বলেন, এটা সাতাশের রাত।(আহমাদ, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী ও ইবনে হিব্বান)

হযরত আবু যারকে(রা) এসম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়। তিনি বলেন, হযরত উমর(রা), হযরত হুযায়ফা(রা), এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহু সাহাবার মনে এ ব্যপারে কোন সন্দেহ ছিল না যে, এটি রমযানের সাতাশতম রাত।(ইবনে আবী শাইবা)

হযরত আবু বকরাহ(রা) রেওয়াত করেছেন, নয় দিন বাকি থাকতে বা সাত দিন বা পাঁচ দিন বা এক দিন বাকি থাকতে অথবা শেষ রাত। তার বক্তব্যের অর্থ ছিল,  এই তারিখগুলোতে কদরের রাতকে তালাশ করো।(তিরমিযী ও নাসায়ী)

হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ কদরের রাতকে রমযানের শেষ দশ রাতের বেজোড় রাতগুলোর মধ্যে তালাশ করো।(বুখারি, মুসলিম, আহমাদ ও তিরমিযী)

হযরত আয়েশা (রা) ও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর(রা) এও বর্ণনা করেছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পুর্ব পর্যন্ত রমযানের শেষ দশ রাতে ইতেকাফ করেছেন।

এই প্রসঙ্গে হযরত মু’আবীয়া (রা) হযরত ইবনে উমর(রা), হযরত ইবনে আব্বাস (রা) অন্যান্য সাহাবীগন যে রেওয়াত করেছেন তার ভিত্তিতে পুর্ববর্তী আলেমগণের বিরাট অংশ সাতাশ রমযানকেই কদরের রাত বলে মনে করেন। সম্ভবত কদরের রাতের শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ব থেকে লাভবান হবার আগ্রহে যাতে লোকেরা অনেক বেশি রাত ইবাদত কাটাতে পারে এবং কোন একটি রাতকে যথেষ্ঠ মনে না করে সে জন্য আল্লাহ ও তার রসুলের পক্ষ থেকে কোন একটি রাত নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়নি। এখানে প্রশ্ন দেখা দেয়, যখন মক্কা মু’আযয্মায় রাত হয় তখন দনিয়ার একটি বিরাট অংশে থাকে দিন, এ অবস্থায় এসব এলাকার লোকেরা তো কোন দিন কদরের রাত লাভ করতে পারবে না।

এর জবাব হচ্ছে, আরবী ভাষায় রাত শব্দটির অধিকাংশ ক্ষেত্রে দিন ও রাতের সমষ্ঠিকে বলা হয়।কাজেই রমযানের এই তারিখগুলো মধ্য থেকে যে তারিখটিই দুনিয়ার কোন অংশে পাওয়া যাবে তার দিনের পূর্বেকার রাতটিই সেই এলাকার জন্য কদরের রাত হতে পারে।

২. মুফাসসিরগন সাধারনভাবে এর অর্থ করেছেন, এ রাতের সৎকাজ হাজার মাসের  সৎকাজের চেয়ে ভালো। কদরের রাত এ গননার বাইরে থাকবে। সন্দেহ নেই একথাটির মধ্যে যথার্থ সত্য রয়ে গেছে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই রাতের আমলের বিপুল ফযীলত বর্ননা করেছেন। কাজেই বুখারী ও মুসলিমে হযরত আবু হুরায়রা(রা) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি কদরের রাতে ঈমানের সাথে এবং আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান লাভের উদ্দ্যেশে ইবাদতের জন্য দাড়ালো সমস্ত গুনাহ মাফ করা হয়েছে”।

৩. রুহ বলতে জিব্রীল আলাইহিস সালামকে বুঝানো হয়েছে। তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার কারনে সমস্ত ফেরেশতা থেকে আলাদা করে তার উল্ল্যেখ করা হয়েছে।

৪. অর্থাৎ তারা নিজেদের তরফ থেকে আসেনা। বরং তাদের রবের অনুমতিক্রমে আসে। আর প্রত্যেকটি হুকুম বলতে সূরা দুখানের পাঁচ আয়াতে “আমরে হাকীম”(বিজ্ঞতাপূর্ণ কাজ) বলতে যা বুঝানো হয়েছে এখানে তার কথায় বলা হয়েছে।

৫. অর্থাৎ সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত সারাটা রাত শুধু কল্যানে পরিপূর্ণ। সেখানে ফিতনা, দুস্কৃতি ও অনিষ্ঠকারিতার ছিটেফোটাও নেই।

(সংগৃহীত)

Facebook Comments
It's only fair to share...Share on Facebook
Facebook
0Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
0