ঈদে মীলাদুন্নবী (সাঃ), কয়েকটি অভিযোগ ; অভিযোগ খন্ডন



15567099773_79b15b518b_bপ্রথম পর্ব-

তামাম সৃষ্টির মূল রাহমাতে আলম (সাঃ) হলেন আল্লাহ পাকের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। আল্লাহ পাক কোন কিছুই সৃষ্টি করতেন না যদি না তিনি রাসুলে আকরাম মোহাম্মাদ (সাঃ) কে সৃষ্টি করতেন। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন-
لو لاك لما خلقت الأفلاك
অর্থাৎ যদি আমি আপনাকে সৃষ্টি না করতাম, তাহলে অন্য কিছু সৃষ্টি করতাম না।
.
এ ব্যাপারে ইমামে আজম, ইমাম আবু হানিফা রাহঃ তার বিখ্যাত কবিত ‘ক্বাসিদাতুন নু’মান’ – এর ৪নং পঙক্তিতে বলেন-
انت الذي لو لاك ما خلق امرأ * كلا ولا خلق الوري لو لاك
অর্থাৎ আপনি হলেন এমন সত্তা, যিনি না হলে মানুষই সৃষ্টি হত না, এবং যিনি না হলে নিখিল-বিশ্বও সৃষ্টি হত না।
.
যে নবীকে সৃষ্টি না করলে কোন কিছুই সৃষ্টি হত না, সে নবীর ওয়ালাদাত শরীফের দিন অবশ্যই সমগ্র পৃথিবী বাসীর নিকট খুশির দিন। তা সত্ত্বেও কতিপয় লোক নবীর এই ওয়ালাদাত শরীফের দিনকে ‘খুশির দিন’ তথা ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ বলতে অস্বীকার করেন এবং ব্যাপারে কিছু আপত্তি/অভিযোগ পেশ করেন। অধিকাংশ সময় তারা যে আপত্তিগুলো করে থাকেন, সেগুলোর ব্যাপারে নিম্নে সম্যক আলোচনা করা হল।
.
‘ঈদে মীলাদুন্নাবী’ সম্পর্কে আপতিত অভিযোগ/আপত্তি সমূহঃ-
১,ঈদে মীলাদুন্নবী ক্বোরআন মাজীদে নাই।
২, হাদীসেও এর কোন অস্তিত্ব নাই।
৩, মুহাদ্দিসীনে কেরাম মুফাসসিরীনে ইজাম গনেরও এব্যাপারে সমর্থন নেই।
৪, এটা বিদআত যা বর্জনীয়।
৫, ঈদ তো ইসলামে দুটি, এটা আবার কিসের ঈদ?
৬, রাসুল (সাঃ) যে বারই রবিউল আঃ জন্মগ্রহণ করেছেন তা তো নিশ্চিত নয়, তবে কেন বেশীরভাগ মানুষ এই দিনকে ঈদে মীলাদুন্নবী বলে?
৭, রাসুল সাঃ যে দিন জন্মগ্রহণ করেছেন সে দিন ইন্তেকালও করেছেন, তো সেদিন খুশি হওয়ার চেয়ে শোক পালন করা যৌক্তিক নয় কি?
.
.
★এক নং আপত্তিঃ
ঈদে মীলাদুন্নবী ক্বোরআন মাজীদে নাই।
.
জবাবঃ-
পবিত্র কোরআনুল কারিমে এমন অনেক আয়াত আছে যেখানে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা রাসুল (সাঃ) এর আগমনের সংবাদ প্রদান তথা মীলাদুন্নাবী এর আলোচনা করছেন।
আল্লাহ বলেন:
لَقَدْ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مِّنْ أَنفُسِكُمْ
তোমাদের মধ্যে থেকেই একজন রাসুল এসেছেন তোমাদের নিকট।
[সুরা তাওবা-আয়াত১২৮]
.
আল্লাহ তায়ালা অন্য আয়াতে ইসা (আঃ) কর্তৃক রাসুল (সাঃ) এর ওয়ালাদাত শরীফের সংবাদ প্রদানের বর্ণনা দিয়ে বলেন:
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُم مُّصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولٍ يَأْتِي مِن بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُم بِالْبَيِّنَاتِ قَالُوا هَٰذَا سِحْرٌ مُّبِينٌ
ইসা (আঃ) বনী ইসরাঈলদেরকে বললেন, আমি হলাম তোমাদের নিকট আল্লাহর রাসুল। আমার পূর্বে প্রেরিত তাওরাত কিতাবের সমর্থক এবং সেই নবীর ব্যাপারে সংবাদ দাতা যিনি আমার পরে আসবেন এবং তার নাম হবে ‘আহমাদ’।
[সূরা আস-ছাফ্- আয়াত ৬।]
.
এছাড়াও আরো অনেক আয়াত আছে যেগুলোতে আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সাঃ) এর মীলাদের সংবাদ প্রদান করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা রাসুল (সাঃ)কে রাহমাত বলেছেন এবং রাহমাত প্রাপ্তির শোকরিয়া স্বরুপ খুশি প্রকাশ করার কথা বলেছেন।
আল্লাহ বলেন:
قُلْ بِفَضْلِ اللَّهِ وَبِرَحْمَتِهِ فَبِذَلِكَ فَلْيَفْرَحُوا هُوَ خَيْرٌ مِمَّا يَجْمَعُونَ
বলুন, এটা আল্লাহর অনুগ্রহ এবং দয়ায়,সুতরাং এতে যেন তারা খুশি হয়।আর এটা তা হতে উত্তম হবে যা তারা পুঞ্জিভূত করে।
[সুরা ইউনুস-আয়াত ৫৮]
.
এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ‘রাহমাত’ বলতে রাসুল (সাঃ) কেই বুজিয়েছেন।যেমন আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
আমি আপনাকে পৃথিবী বাসীর জন্য ‘রাহমাত’ স্বরুপ পাঠিয়েছি।
[সুরা আমবিয়া-আয়াত ১০৭]
.
এছাড়াও রাহমাত শব্দের তাফসীরে মুফাসসিরীনে কিরামগন রাসুল (সাঃ) কেই উল্লেখ করেছেন।
.
‘রাহমাহ’ এর তাফসীরে ইমাম ইবনুল জাওযী (রাহ) বলেন
أن فضل الله: العلم، ورحمته: محمد صلى الله عليه وسلم، رواه الضحاك عن ابن عباس.
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে আদ-দাহহাক বর্ণনা করেন ‘ফাদ্বলুল্লাহ’ হলো ইলম আর ‘রাহমাত’ হলেন মুহাম্মাদ (সাঃ)।
[যা’দ আল মাসায়ির ফী ইলমিত তাফসীর ৪/৪০]
ইমাম আবু হায়্যান আন্দালুসী (রাহঃ) বলেন
الفضل علم والرحمة محمد صلى الله عليه وسلم
অর্থাৎ, ‘ফাদ্বলুল্লাহ’ হলো ইলম আর ‘রাহমাত’ হলেন রাসুল (সাঃ)।
[তাফসীরে বাহরুল মুহিত ৫/১৭১]
.
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টতর হয় যে আল্লাহ তায়ালা ক্বোরআনুল কারীমে রাসুল (সাঃ) এর ওয়ালাদাত শরীফের খুশি উদযাপন করার বৈধতা প্রদান করেছেন।
আর আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ক্বোরআনে বিভিন্ন স্থানে নেয়ামাতের শুকর করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন
যেমনঃ
وَاذْكُرُواْ نِعْمَتَ اللّهِ عَلَيْكُمْ
তোমরা আল্লাহর নিয়ামতের আলোচনা কর।
[সূরা বাক্বারা: ২৩১]
এছাড়াও সুরা দুহা’য় আল্লাহ বলেন
وَأَمَّا بِنِعْمَةِ رَبِّكَ فَحَدِّثْ
আর আপনার রবের নিয়ামতের আলোচনা করুন।
[সুরা দুহা: ১১]
উক্ত আয়াতে কারিমা গুলোতে আল্লাহ পাক নেয়ামাতের আলোচনা করার নির্দেশ দিচ্ছেন।
আর এটা সর্বজন মান্য যে রাসুল (সাঃ) হলেন আল্লাহ প্রদত্ত পৃথিবীবাসীর প্রতি নেয়ামতগুলোর মধ্যে সর্ব শ্রেষ্ঠ।

                                                                                                                                         চলবে………………

লেখক- সায়ীদ হোসাইন চৌধুরী

শিক্ষার্থী, ১ম বর্ষ, আরবী সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Facebook Comments
It's only fair to share...Share on Facebook
Facebook
188Share on Google+
Google+
0Tweet about this on Twitter
Twitter
Share on LinkedIn
Linkedin
0